কমলনগর প্রতিদিনের নিজস্ব প্রতিবেদক :মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে বছরের পর বছর ভিটেমাটি ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের হাজারো মানুষ। নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া সেইসব এলাকার কিছু অংশে এখন আবার জেগে উঠছে নতুন চর। বিস্তীর্ণ চরে সবুজ ঘাস আর উর্বর মাটি দেখে হারানো জমি ফিরে পাওয়ার আশায় নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন ভাঙনকবলিত কৃষকেরা। তবে চর জাগার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে দখল নিয়ে বিরোধ ও শঙ্কা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার ‘কটোরিয়া ও কাঁকড়ার চর’ এলাকায় জেগে ওঠা প্রায় ৬০০ একর চর কয়েক বছর ধরে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী ‘মাতব্বর’ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তারা ওই চর নিজেদের দখলে নেয়। সম্প্রতি চরটি ভোলার চরফ্যাশনের বাসিন্দা সকেট জামালের কাছে এক বছরের জন্য ৩৪ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এদিকে দক্ষিণ জগবন্ধু সীমানায় নতুন করে জেগে ওঠা চর নিয়েও একই ধরনের দখলের আশঙ্কা করছেন ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিকেরা। তাদের দাবি, নতুন জেগে ওঠা ভূখণ্ডে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কোনো বৈধ মালিকানা নেই। তারপরও তারা চরটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সাল থেকে মেঘনার ভয়াবহ ভাঙনে কমলনগর উপজেলার প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ২০১৩-১৪ সালের দিকে চর কালকিনি ও সাহেবেরহাট ইউনিয়নের বড় একটি অংশ নদীতে তলিয়ে যায়। একইভাবে চর ফলকন, পাটওয়ারীরহাট ও চর লরেন্স ইউনিয়নেরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে চলে যায়। এতে হাজার হাজার পরিবার ভিটেমাটি ও ফসলি জমি হারিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন।
সম্প্রতি মেঘনার বুকে আবারও দৃশ্যমান হচ্ছে হারিয়ে যাওয়া ভূখণ্ডের কিছু অংশ। কমলনগর উপজেলার দক্ষিণ জগবন্ধু সীমানায় বড় একটি চর জেগে উঠেছে। এর আগে প্রায় পাঁচ বছর ধরে কটোরিয়া ও কাঁকড়ার চর এলাকায়ও প্রায় ৬০০ একর জমি দৃশ্যমান রয়েছে। নতুন চর জেগে ওঠার পর থেকেই এসব জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় ভূমিমালিকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
জমি ফিরে পেতে এবং কথিত জবরদখল ঠেকাতে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিকেরা ‘চর জগবন্ধু, ফলকন ও পাটওয়ারীরহাট ভূমিমালিক ঐক্য পরিষদ’ গঠন করেছেন।
দক্ষিণ জগবন্ধু ভূমিমালিক সমিতির সভাপতি জহির উদ্দিন রিয়াজ বলেন, “সাহেবেরহাট ইউনিয়নের দক্ষিণ জগবন্ধুর নিজস্ব সীমানায় নতুন এই চর জেগে উঠেছে। এতে মাতব্বরদের কোনো জমি নেই। প্রকৃত ভূমিমালিকেরা যেন শান্তিপূর্ণভাবে চাষাবাদ করতে পারেন, আমরা সেই চেষ্টা করছি।”
পাটওয়ারীরহাট ইউনিয়নের ভূমিমালিক সমিতির নেতা জাহাঙ্গীর মেম্বার বলেন, “ভাঙনের শিকার জগবন্ধু, ফলকন ও পাটওয়ারীরহাটের ক্ষতিগ্রস্ত সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছি। কিন্তু একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী জমিগুলো জোরপূর্বক ভোগদখলের চেষ্টা করছে বলে আমরা জানতে পারছি।”
সাহেবেরহাট ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর মো. মাসুদ অভিযোগ করেন, “আগে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একটি চর দখল করে সুবিধা নেওয়া হয়েছে। এখন প্রকৃত ভূমিমালিকদের বঞ্চিত করে দক্ষিণ জগবন্ধুর নতুন চরটিও দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে।”
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাতব্বর বংশের পক্ষে খোকন মাতব্বর। তিনি বলেন, “এককভাবে যে চরটি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেটি আমাদের পূর্বপুরুষ ও আত্মীয়স্বজনদের চাষাবাদের জমি। নতুন করে জেগে ওঠা চরটিতে আমাদের বসতবাড়ি ছিল। তাই ওই চরে আমাদের দাবি থাকাটা স্বাভাবিক।”
৩৪ লাখ টাকায় চর ইজারা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে খোকন মাতব্বর বলেন, “সেখানে অন্য কারও জমি নেই। তাই সেখানে আমরা যা করি, তা আমাদের নিজস্ব বিষয়।”
এ বিষয়ে কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাহাত উজ জামান বলেন, “চর পুরোপুরি জেগে উঠলে জরিপ পরিচালনা করা হবে। এরপর বিধি অনুযায়ী তা বন্দোবস্ত দেওয়া হবে। এর আগে চরের ওপর কারও মালিকানা দাবি করার সুযোগ নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষের কাছে নতুন করে জেগে ওঠা এসব চর তাই শুধু নতুন ভূমি নয়—এটি তাদের হারানো জীবন ও জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক নতুন আশার প্রতীক। তবে জরিপ ও সরকারি বন্দোবস্তের আগে চর নিয়ে বিরোধ ও দখলচেষ্টার অভিযোগ স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।