প্রাচীন মিশরীয় মমির গোপন রহস্য উন্মোচন করল মেডিকেল স্ক্যান

কয়েক হাজার বছর আগের কথা। প্রাচীন মিসরে কোনো মানুষের মৃত্যু হলে তাঁর শরীরকে বিশেষ উপায়ে সংরক্ষণ করা হতো। শরীর থেকে পচনশীল অঙ্গ বের করে, বিশেষ লবণ মেখে, দিনের পর দিন শুকিয়ে লিনেন কাপড়ে পেঁচিয়ে তৈরি করা হতো মমি। বিজ্ঞানীদের কাছে এই মমিগুলো সব সময়ই ছিল আকর্ষণের বিষয়। কিন্তু একটা সময় মমি নিয়ে গবেষণা করা মানেই ছিল বিশাল ঝুঁকি। কারণ, ভেতরের খবর জানতে কাপড়ের পরত খুলতে গেলেই মমির প্রাচীন কাঠামো ভেঙে পড়ার ভয় থাকত। অনেক মমি এভাবেই চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু এখন দিন বদলেছে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জাদুতে কাপড়ের কোনো সুতো না ছুঁয়েই বেরিয়ে আসছে হাজার বছর ধরে লুকিয়ে থাকা সব রহস্য!

হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট শহরে রয়েছে সেমেলউইস মিউজিয়াম অব মেডিকেল হিস্ট্রি। এটি একটি চিকিৎসা সংক্রান্ত জাদুঘর, লাইব্রেরি এবং আর্কাইভ। ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরে বেশ কয়েকটি প্রাচীন মিসরীয় মমি সংগ্রহ করা হয়। অনেক দিন ধরেই বিজ্ঞানীরা চাইছিলেন, এই মমিগুলোর ভেতরের খবর জানতে। অবশেষে তাঁরা দারুণ এক প্রযুক্তির সাহায্যে সেই খবর জানতে শুরু করেছেন। সেই প্রযুক্তির নাম হাই-রেজোলিউশন সিটি স্ক্যান।

একটি মমির মাথাসেমেলউইস ইউনিভার্সিটির মেডিকেল ইমেজিং সেন্টারের প্রধান ক্লিনিক্যাল ফিজিশিয়ান ও রেডিওলজিস্ট ইবোলকা দুদাস এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর মতে, এই পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য মমির ভেতরের কাঠামোর একদম নিখুঁত ছবি পাওয়া। ফলে মমিগুলোর ভেতরে কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কি না এবং হাজার বছর আগে ঠিক কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এদের সংরক্ষণ করা হয়েছিল, তা সহজেই জানা যাবে।

Advertisement

কীভাবে বানানো হতো মিসরের মমি হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট শহরে রয়েছে সেমেলউইস মিউজিয়াম অব মেডিকেল হিস্ট্রি। ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরে বেশ কয়েকটি প্রাচীন মিসরীয় মমি সংগ্রহ করা হয়।সিটি স্ক্যান বা কম্পিউটেড টমোগ্রাফি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। সোজা কথায় বলতে গেলে, এটি হলো এক্সরের একটা অত্যাধুনিক এবং হাই-রেজ্যুলিউশন রূপ। এতে ঘূর্ণায়মান এক্সরে মেশিন ও কম্পিউটার ব্যবহার করে যেকোনো বস্তু বা জীবন্ত শরীরের ভেতরের একদম নিখুঁত 2D বা থ্রিডি ছবি তৈরি করা যায়।

মানুষের চিকিৎসায় তো এর ব্যবহার আছেই, কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন প্রাচীন জীবাশ্ম, পোকামাকড়ের অতি সূক্ষ্ম মস্তিষ্ক, এমনকি মঙ্গল গ্রহ থেকে আসা উল্কাপিণ্ডের ভেতরের খবর জানতেও এটি ব্যবহার করছেন। এতে জিনিসটার একটুও ক্ষতি হয় না, আবার ভেতরের সব তথ্যও পানির মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। ইবোলকা দুদাস এবং তাঁর দল জাদুঘরের এই মমিগুলো পরীক্ষা করার জন্য অত্যাধুনিক ফোটন কাউন্টিং ডিটেক্টরযুক্ত নতুন প্রজন্মের সিটি স্ক্যানার ব্যবহার করছেন।

একটি মমির পাজাদুঘরের কিউরেটর ক্রিস্টিনা শেফার জানিয়েছেন, এর আগেও একটি গবেষক দল মমিগুলো নিয়ে কাজ করেছিল। কিন্তু নতুন সিটি স্ক্যানারের ছবিগুলো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট। তাই তাঁরা আশা করছেন, কয়েক দশক ধরে জাদুঘরে থাকা এই মমিগুলো থেকে অনেক নতুন এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য বেরিয়ে আসবে। ইতিমধ্যে জাদুঘরের ছয়টি মমির কার্বন ডেটিং পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো মমিটি আজ থেকে প্রায় দুই হাজার ৪০০ বছর আগের। তবে মিসরীয়রা এরও কয়েক হাজার বছর আগে থেকে মৃতদেহ মমি করা শুরু করেছিল।

পিরামিডের মমিও কি সর্দিতে ভুগেছিল?জাদুঘরের কিউরেটর ক্রিস্টিনা শেফার জানিয়েছেন, এর আগেও একটি গবেষক দল মমিগুলো নিয়ে কাজ করেছিল। কিন্তু নতুন সিটি স্ক্যানারের ছবিগুলো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট।মমিগুলোর স্ক্যান করা ডেটা নিয়ে এখনো অনেক বিশ্লেষণ চলছে। তবে এর আগে বিশ্বের নানা প্রান্তে হওয়া অন্যান্য মমি স্ক্যানিং প্রকল্পগুলো থেকে আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবন সম্পর্কে চমৎকার সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। প্রাচীন মিসরের লোকেরা মৃত্যুর পর পরকালে বিশ্বাস করত। তাই যারা মমি তৈরি করত, তারা প্রায়ই লিনেন কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে দামি জিনিসপত্র, মুদ্রা ও জাদুকরি তাবিজ লুকিয়ে রাখত। স্ক্যানের মাধ্যমে এই জিনিসগুলো স্পষ্ট দেখা যায়। এ ছাড়া অন্যান্য মিসরীয় মমির স্ক্যানে তাদের স্বাস্থ্যের নানা সমস্যার কথাও জানা গেছে। যেমন, অনেকেই আর্থ্রাইটিসের ব্যথায় ভুগত। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাচীন মিসরীয় শিশুদের মধ্যে অ্যানিমিয়ার হার অনেক বেশি ছিল।

এমনকি প্রাচীন মানুষের শরীরে লুকিয়ে থাকা ক্যানসারের জীবাণুও সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে ধরা পড়েছে। একবার দক্ষিণ আমেরিকার প্রাচীন কিছু মমি সিটি স্ক্যান করে বিজ্ঞানীরা সেখানে এক ভয়ংকর গণহত্যার প্রমাণ পেয়েছিলেন। এ ছাড়া ইতিহাসের বিখ্যাত ফারাও রাজা তুতেনখামেনের মমিও সিটি স্ক্যান করা হয়েছিল। তা থেকেই বিশ্ববাসী জানতে পারে, ম্যালেরিয়া এবং পা ভাঙার কারণেই মূলত তাঁর মৃত্যু হয়েছিল!

প্রাচীন মিসরে বিজ্ঞানচর্চাপ্রাচীন মিসরের লোকেরা মৃত্যুর পর পরকালে বিশ্বাস করত। তাই যারা মমি তৈরি করত, তারা প্রায়ই লিনেন কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে দামি জিনিসপত্র, মুদ্রা ও জাদুকরি তাবিজ লুকিয়ে রাখত।সেমেলউইস জাদুঘরের মমিগুলোর প্রাথমিক বিশ্লেষণ থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, মমি তৈরির কৌশল দেখেই অনেক মমির বয়স সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যাবে। এর মধ্যে একটি মমির প্যাকেট গবেষকদের রীতিমতো অবাক করে দিয়েছে। বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনো উপায়ই ছিল না যে এর ভেতরে কী আছে। মিসরীয়রা অনেক সময় পাখিদেরও মমি করত, তাই গবেষকদের ধারণা ছিল হয়তো এর ভেতরে কোনো পাখি আছে। আবার কারও কারও মনে হয়েছিল, এটি হয়তো মানুষের কাটা মাথা! কিন্তু সিটি স্ক্যান করার পর সবাই তো অবাক! দেখা গেল, ওই প্যাকেটের ভেতরে আসলে মানুষের একটি কাটা পা মমি করে রাখা আছে!

একটি মমির হাতের সিটিস্ক্যানআরেকটি মমির স্ক্যান থেকে জানা গেছে, ওই মানুষটি হাড় ক্ষয়ে যাওয়ার রোগে ভুগতেন। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, সামনের দিনগুলোতে স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে এই মানুষগুলোর জীবন ও মমি তৈরির কৌশল সম্পর্কে অজানা আরও অনেক তথ্য বেরিয়ে আসবে।

আধুনিক ইমেজিং প্রযুক্তি মমি গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এটি হাজার হাজার বছরের পুরোনো নিদর্শনগুলোর কোনো ক্ষতি না করেই তাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা তথ্য আমাদের সামনে তুলে আনতে পারে। তাই সামনের দিনগুলোতে হয়তো মিসরের প্রাচীন মমিগুলো থেকে এমন সব রহস্য বেরিয়ে আসবে, যা আগে কেউ কল্পনাও করেনি!

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

সূত্র: সেমেলউইস মিউজিয়াম অব মেডিকেল হিস্ট্রি, সায়েন্স অ্যালার্ট ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফি
প্রাচীন মিশর থেকে আধুনিক বিজ্ঞানে চুল গজানোর রহস্য

Share this news as a Photo Card

Add a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement
22 April 2026

প্রাচীন মিশরীয় মমির গোপন রহস্য উন্মোচন করল মেডিকেল স্ক্যান

www.kamalnagarpratidin.com