পূর্ব লন্ডনের স্থানীয় নির্বাচনে লড়ছেন তিন শতাধিক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী

চারটি বরোর মোট ৮৫টি ওয়ার্ডে ২২৫টি কাউন্সিলর আসনের বিপরীতে লড়ছেন প্রায় এক হাজার প্রার্থী। এর মধ্যে ৩০০-এর বেশি প্রার্থীই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত।

পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি অধ্যুষিত চারটি বরোতে (প্রশাসনিক এলাকা) আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তিন শতাধিক প্রার্থী কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। টাওয়ার হ্যামলেটস, নিউহাম, রেডব্রিজ ও বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহাম—এই চার বরোতে আগামী ৭ মে ভোট হচ্ছে।

নির্বাচনী পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবার প্রার্থীরা মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও লড়ছেন। ফলে এবারের নির্বাচনে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক প্রভাব নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

চারটি বরোর মোট ৮৫টি ওয়ার্ডে ২২৫টি কাউন্সিলর আসনের বিপরীতে লড়ছেন প্রায় ১ হাজার প্রার্থী। এর মধ্যে ৩০০-এর বেশি প্রার্থীই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি প্রার্থী রয়েছেন টাওয়ার হ্যামলেটসে। এরপরই রয়েছে নিউহাম, রেডব্রিজ ও বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহামের অবস্থান।

Advertisement

টাওয়ার হ্যামলেটস

পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে বরাবরের মতোই বাংলাদেশিদের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি। এখানকার ২০টি ওয়ার্ডের ৪৫টি আসনের বিপরীতে লড়ছেন ১২১ জন বাংলাদেশি। বর্তমান নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান নিজেও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত।

এবারের নির্বাচনে স্থানীয় দল এসপায়ার পার্টি ও টাওয়ার হ্যামলেটস ইনডিপেনডেন্ট সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশিকে মনোনয়ন দিয়েছে। ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি থেকে মেয়র পদে সিরাজুল ইসলামসহ কাউন্সিলর পদে লড়ছেন ২৫ জন বাংলাদেশি।

উল্লেখ্য, এই বরোর দুই বর্তমান এমপি রুশনারা আলী ও আপসানা বেগমও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, এই বরোর প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষই বাংলাদেশি।

নিউহাম

নিউহাম কাউন্সিলেও বাংলাদেশিরা একটি বড় শক্তি। এখানকার ২৪টি ওয়ার্ডের ৬৬টি আসনের বিপরীতে লড়ছেন ৮৭ জন বাংলাদেশি প্রার্থী। লেবার পার্টি, কনজারভেটিভ ও গ্রিন পার্টি ছাড়াও ‘নিউহাম ইনডিপেনডেন্ট’ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অনেক বাংলাদেশি মাঠে রয়েছেন।

নিউহামে এবার মেয়র পদে লেবার পার্টি থেকে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরহাদ হোসেন এবং গ্রিন পার্টি থেকে আরিক চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রায় সাড়ে তিন লাখ জনসংখ্যার এই বরোতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করেন। প্রায় দুই লাখ ভোটারের এই কাউন্সিলে জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি ভোট অন্যতম বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

রেডব্রিজ

রেডব্রিজেও বাংলাদেশিদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। এই বরোর ২২টি ওয়ার্ডে ৬৩টি আসনের বিপরীতে লড়ছেন প্রায় ৩০০ প্রার্থী। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীর সংখ্যা ৫৫। প্রধান দুই দল লেবার ও কনজারভেটিভ পার্টি থেকেই সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি প্রার্থী মনোনয়ন পেয়েছেন। এর বাইরে গ্রিন পার্টিসহ বিভিন্ন ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্ল্যাটফর্ম থেকেও লড়ছেন অনেকে।

রেডব্রিজের জনসংখ্যা তিন লাখের বেশি, যার মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার বাংলাদেশি। সাম্প্রতিক সময়ে ইলফোর্ড এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উত্থানে বাংলাদেশি প্রার্থীদের প্রভাব আগের চেয়ে বেড়েছে।

বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহাম

পূর্ব লন্ডনের এই বরোর ১৯টি ওয়ার্ডে ৫১টি আসনের বিপরীতে লড়ছেন প্রায় ২০০ প্রার্থী। এর মধ্যে ৩৪ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। তাঁদের বেশির ভাগই লেবার, কনজারভেটিভ ও গ্রিন পার্টির মনোনীত।

বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহামের প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার জনসংখ্যার মধ্যে ২০ থেকে ২৫ হাজার বাংলাদেশি। এই বরোর সাবেক মেয়র মঈন কাদরী এবার দল বদলে আলোচনায় এসেছেন। তিনি লেবার পার্টি ছেড়ে গ্রিন পার্টির হয়ে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

লড়াইয়ের সমীকরণ

চারটি বরোতেই লেবার পার্টি প্রধান শক্তি হিসেবে মাঠে থাকলেও কনজারভেটিভ, গ্রিন, লিবডেমসহ বিভিন্ন স্বতন্ত্র ও স্থানীয় প্ল্যাটফর্মের প্রার্থীরাও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন। বিশেষ করে টাওয়ার হ্যামলেটস ও নিউহামে আঞ্চলিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আধিক্য নির্বাচনের সমীকরণকে বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশি কমিউনিটির এই ব্যাপক অংশগ্রহণ শুধু প্রার্থী সংখ্যায় নয়, বরং ভোটের ফল নির্ধারণেও বড় ভূমিকা রাখবে। স্থানীয় নির্বাচনে এই বিপুল প্রার্থিতা ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও আগ্রহের বড় ইঙ্গিত। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই প্রার্থীদের মধ্য থেকেই অনেকে ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেবেন।

উল্লেখযোগ্য প্রার্থী

এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন বরো থেকে লড়ছেন একঝাঁক পরিচিত মুখ। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অজন্তা দেব রয়, সায়মা আহমেদ, হামিম চৌধুরী, রাবিনা খান, আবু তালহা চৌধুরী, রহিমা রহমান, সৈয়দ আবুল বাশার, আব্দুল কাদির চৌধুরী মুরাদ, সাঈদা চৌধুরী ও মঈন কাদরী।

Add a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement